আমাদের শরীরে রক্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে , রক্ত আমাদের শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে , অ্যান্টিবডি শরীরের তাপ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে আর শরীরের বর্জ্য পদার্থ কে পরিবহন করে বৃক্ক (কিডনি) আর যকৃৎ এ (লিভারে), এই ভাবে শরীর কে পরিষ্কার করে । রক্ত শরীরের ওজনের ৭ শতাংশ তৈরি করে,এই রক্তের ৪৫ শতাংশ তৈরি হয় লোহিত রক্তকণিকা অথবা RBC (Red Blood Cell) দ্বারা । যখন রক্তে এই লোহিত রক্তকণিকার মাত্রা কমে যায় অথবা হিমোগ্লোবিন কমে যায় যা অক্সিজেন বহন করে তখনকার অবস্থাকে বলা হয় রক্তাল্পতা অথবা অ্যানিমিয়া ।
সাধারণত, এটি বিশ্বাস করা হয় যে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা কেবলমাত্র অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে ঘটে থাকে। দুর্ভাগ্যবশত, এটি সত্য নয়। এখানে শিশুদের অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা অসুখের কিছু সাধারণ বা প্রাথমিক উপসর্গ দেওয়া হলো ।
১। ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া
বাচ্চাদের গাল সাধারণত লাল হয় , কিন্তু যদি তাদের গায়ের রঙ ফ্যাকাসে , হলুদ বা ছাই রঙের হয়ে যায় আর গাল আর নখের রঙ আর তেমন লাল না থাকে তাহলে সেই বাচ্চার অ্যানেমিয়া বা রক্তাল্পতা আছে ধরে নিতে হবে । আরেকটি লক্ষণ হতে পারে চোখের সাদা অংশের মধ্যে একটি নীল রঙ। যদিও এই পরিবর্তনগুলি ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে পারে, তবে সাধারণত অন্যান্য উপসর্গগুলির সাথে এগুলি দেখা যায়।
২। সারাদিন ক্লান্ত থাকে
অ্যানেমিয়ায় আক্রান্ত বাচ্চারা খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পরে । তাদের সারাদিন ঘুম ঘুম পায় , হালকা মাথা ঘোরে , হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত হয় , শ্বাস নিতে কষ্ট হয় অথবা খুব দ্রুত শ্বাস পরে , তারা কোনও পরিশ্রমের কাজ বা বেশি দৌড় ঝাঁপ করতে পারেনা যেমন – দৌড়ানো বা বাইরে খেলা ধুলা । এমন কি সিঁড়ি দিয়ে উঠলে মাথা ঘুরে যায় আর হাঁফিয়ে পড়ে ।
৩। পাইকা
আমাদের শরীর বুঝিয়ে দেয় শরীরে কিসের অভাব রয়েছে কিছু জিনিষের ওপর তীব্র আকাঙ্ক্ষার দ্বারা । যদি আপনি দেখেন আপনার বাচ্চা উল্টো পাল্টা জিনিস খাচ্ছে যেমন মাটি , কর্ন ফ্লাওয়ার , বরফ ,বা ধুলো বালি তাহলে বুঝবেন শরীরে আয়রন এর অভাব হয়েছে , এই অবস্থা কে বলে পাইকা ।
৪। শরীরের বিকাশ ঠিকমতো হয়না
অ্যানেমিয়ায় শিশুদের শারীরিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় , আর স্বভাবে ও পরিবর্তন ঘটে যেমন অমনোযোগী হওয়া , সকলের সাথে মিশতে না পারা এর ফলে কর্মশক্তি হ্রাস পায় এবং কোনো কিছু চট করে শিখতে পারেনা ।
৫। ক্ষত সারতে দেরি হয়
অ্যানেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের খুব ধীর গতিতে ক্ষত বা আঘাত সারে , তারা ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পরে । কারণ RBC বা লোহিত রক্ত কণিকা প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে , ফলে শিশুদের রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায় , আর সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে । তাছাড়া তাদের ক্ষত দেরী করে সেরে ওঠে এবং অনেকদিন পর্যন্ত থাকে।
৬। অন্য লক্ষণ
অন্য লক্ষণ যা বাচ্চাদের মধ্যে দেখা যায় সেগুলো হল জিভ ফুলে যাওয়া , বিরক্তি ভাব , সারাক্ষণ মাথা ব্যাথা, বর্ধিত প্লীহা , জন্ডিস , আর চা এর মতো প্রস্রাবের রঙ ।
অ্যানেমিয়ার চিকিৎসা
এটা সব সময় বাধ্যতামুলক নয় যে বাচ্চার অ্যানেমিয়া থাকলে উপরিক্ত সব উপসর্গ বোঝা যাবে , যদি একটা উপসর্গও দেখা যায় তাহলে সঙ্গে সঙ্গে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ এর সাথে পরামর্শ করা আবশ্যক যাতে প্রয়োজনীয় সমস্ত পরীক্ষা গুলো করিয়ে নেওয়া যায় যা বাচ্চার অসুখ নিরাময়ের জন্য দরকারি ।
অ্যানিমিয়া বেশ কয়েকটি কারণের জন্য হতে পারে, এই অসুখের তীব্রতার উপর নির্ভর করে চিকিৎসক সুপারিশ করতে পারেন এমন কিছু পরীক্ষাগুলির মধ্যে আছে সম্পূর্ণ রক্ত গণনা complete blood count , রক্ত পরীক্ষা , আয়রন পরীক্ষা , হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফোরেসিস , অস্থি মজ্জা অ্যাসপিরেশন ,বায়োপসি আর রেটিকলুলসাইট গণনা । শুরুতে ধরা পড়লে সঠিক চিকিৎসার দ্বারা খুব সহজে এই অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব ।
Image sources: Pixabay

